Friday, February 24, 2012

বাংলা ভাষা নিয়ে আদালতের আদেশ ও আমার ভাবনা

সম্প্রতি প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করে আদালতে আদেশ হয়েছে। আদালতের কোন রায় সম্পর্কে মন্তব্য করা বিপদজনক। তাই যথাযথ সম্মান রেখেই বলি- ভাষা কখনও ব্যাকরণ কিংবা শাসকের আদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলনা। ভাষা চলেছে নিজস্ব গতিতেই। সেখানে শুদ্ধতাবাদীদের ধমক কোন কাজ করেনি। না বাংলা ভাষায় না বিদেশী ভাষায়। বাংলা ভাষার কথাই যদি ধরি। তাহলে দেখতে পারব, দেড় হাজার বছর আগে থেকে নানারকম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে ভাষা আজকে এই অবস্থানে এসেছে, তা কোন শাসকের অনুকম্পায় ঘটেনি। সাধারণ মানুষ নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী যখন যে উৎসকে প্রয়োজনীয় ভেবেছে, সেখান থেকেই নতুন শব্দ গ্রহণ করেছে। ফলে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে সাওতাল, মুন্ডা ভাষার পাশাপাশি আরবি, ফারসি, গুজরাটি, চিনা, পর্তুগিজ ইত্যাদি ভাষার শব্দেরও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মহামান্য আদালত এই বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চয় সচেতন আছেন বলেই আমার ধারণা।

তাহলে এখন সমস্যা হল কি? আদালতের বেশিরভাগ বিষয়ের নাম তো আরবি ফারসিতে। আদালত, আইন, কানুন, হাকিম, নাজির, উকিল, পেশকার, হুকুম, শমন ইত্যাদি শব্দ তো বিদেশি। তারা নিজেরাও আদালতীয় কার্যক্রম চালান ইংরেজিতে। বাংলায় আদালতে কার্যক্রম পরিচালনার দাবি সেই কতদিন থেকেই তারা উপেক্ষা করে যাচ্ছেন, তখন তো ভাষার শুদ্ধতা বা প্রমিতি নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠেনি। তাহলে এখন উঠছে কেন?

বাংলা ভাষায় হিন্দি ভাষার মিশ্রণ ঘটছে, সেজন্য কি? এটা কি শুধু হিন্দু বা ভারতবিরোধী মানসিকতার কারণে ঘটছে? এখানেও আপত্তি আছে। বাংলাদেশের মুসলমানরা ঐতিহাসিক কাল থেকে বাংলাদেশি সংস্কৃতির বিরোধীতা করে আসছে। আরবীয় সাম্রাজ্যবাদের দাসত্বের কারণে তারা এদেশীয় ধর্ম সংস্কৃতির বিরোধীতা করেছে। মুসলমানরা বিরোধীতার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ও নোংরামোর পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে তারা ব্যক্তিগত জীবনেও বিদেশী ভাষা ব্যবহার করে। যা কিছু হিন্দু স্পর্শ আছে, তার সবকিছুকেই মুসলমানিত্ব করার চেষ্টা করেছে। ব্যাক্তিগত-পারিবারিক জীবনে ব্যবহৃত শব্দগুলোও তারা বিদেশী শব্দ থেকে নিয়েছে। বিশেষত তারা পারিবারিক জীবনে যে সব শব্দ ব্যবহার করে, তার বেশিরভাগগুলোই তো হিন্দি ভাষা। আব্বা, আম্মা, ফুপু, ফুপা, খালা, খালু, ভাই, ভাবি এমনকি জল না বলে যে পানি বলে সেটাও তো হিন্দি ভাষা।

আদালতে বর্তমান আদেশকে যদি আমলে আনি, তাহলে তো বলতে হয় এসব শব্দ যখন মুসলমানরা ব্যবহার করে তখন তারা সচেতনভাবেই বাংলা ভাষাকে দূষিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। সেক্ষেত্রে আদালতে মনোভঙ্গি জানতে বড়ই ইচ্ছা করে।

আদালতের প্রত্যাশা বুঝি। আদালত চায় বাংলা ভাষাকে যেন অন্য ভাষার মিশ্রণ দিয়ে দূষণ না করা হয়। মনোভঙ্গিটি নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে, সেদিকে না গিয়ে আমি সহজভাবে বলতে চাই: - আপনারা আগে নিজেদের পরিমণ্ডলে বাংলা শব্দ চালু করুন। বাংলা শব্দভান্ডার থেকে বিদেশী শব্দ তথা আরবি, ফারসি ভাষার নোংরামি বাদ দেয়ার আদেশ দিন, বাংলাদেশের দোকানপাট, পণ্যের মোড়ক, যন্ত্রপাতির বর্ণনা ইত্যাদিতে বিদেশি তথা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ করুন, আনাচে কানাচে গড়ে ওঠা বিদেশি ভাষা তথা ইংরেজি, আরবি ভাষা শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করুন, বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারকে আদেশ দিন, তাহলে যদি আপনাদের আন্তরিকতার সত্যতা কিছু ফুটে ওঠে। তা না হলে, তরুণ সমাজ তার নিজের জন্য যে ভাষা বেশি প্রয়োজন/ গুরুত্ববহ, তাই গ্রহণ করবে; তা না হলে আপনাদের এই আদেশ ফেব্রুয়ারি মাসের সস্তা জনপ্রিয়তার প্রচেষ্টা হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং আগামী দিনগুলোতে হাস্যকর মুখরোচক আলোচনার খোরাক হয়েই থাকবে।

প্রসঙ্গিক বিবেচনায় বিডিনিউজ২৪ এ প্রকাশিত আফসান চৌধুরী এর "ভাষা নিয়ে বাড়াবাড়ি কি শেষ পর্যন্ত “ভাষা-পুলিশ” এর জন্ম দেবে" শীর্ষক প্রবন্ধটির লিংক এই ব্লগপোস্টের সাথে সংযুক্ত করলাম।

0 comments:

Post a Comment

 

Blog Archive

© 2012-2017 আমার ইতিহাস | Powered by: Blogger