Sunday, May 6, 2012

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ধর্মের হাতে নিহত জ্ঞান

ভারতীয় উপমহাদেশের বুদ্ধিমত্ত্বা ও চিন্তাশক্তির পরম নিদর্শণ বৌদ্ধবিহারগুলো। সেকালে এই বৌদ্ধবিহারগুলো জ্ঞানচর্চায় এত খ্যাতি অর্জন করেছিল যে দেশ দেশান্তর থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়াশোনা করতে আসতো। এরকম একটি বৌদ্ধবিহার ছিল নালন্দা বৌদ্ধবিহার। সেকালের বৌদ্ধবিহারগুলো ছিল মূলত আধুনিককালের বিশ্ববিদ্যালয় সমমানের। মুক্তচিন্তা, মানবতা, জ্ঞান-দর্শন-বিজ্ঞান চর্চার উপযুক্ত উদার পরিবেশ ছিল। ফলে ছাত্ররা যে শিক্ষা পেত তা ছিল আন্তর্জাতিকমানের।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ বিহার ছাত্রাবাস, পাঠকক্ষ, শ্রেণীকক্ষ
নালন্দার ছাত্রাবাস, পাঠকক্ষ
পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙালি পণ্ডিত শীলভদ্র দীর্ঘকাল অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এর শিক্ষক ছিলেন। প্রায় ২০-২৫ বৎসর হিউয়েন সাং শিলভদ্রের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। অতীশ দীপঙ্কর এখানে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি টিকে ছিল ১১৯৭ সাল পর্যন্ত। ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজির হাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ধ্বংস হয়। বখতিয়ার নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০০০০ ছাত্র ও ২০০০ শিক্ষকের প্রত্যেককে তরবারির আঘাতে গলা কেটে, শরীর কেটে, রক্তপাত ঘটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে খুন করেছে।


নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ বিহার লাইব্রেরি পাঠাগার গ্রন্থাগার
নালন্দার গ্রন্থাগার
বিশাল লাইব্রেরিটি মাসের পর মাস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছে। বই পোড়া ধোঁয়া এত বেশি ছিল যে নিচু পাহাড়গুলোর মাথায় সেই ধোঁয়া প্রায় ছয় মাস ঝুলে ছিল। খিলজি লাইব্রেরিতে কোরান খুজছিল। না পেয়ে সবকটি বইকে অপ্রয়োজনীয়, অপাঠ্য বিবেচনায় ধ্বং করেছে।

পারস্যের ইতিহাসবিদ 'মিনহাজ' তার 'তবকাত ই নাসিরি' গ্রন্থতে বখতিয়ার খিলজির নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের কাহিনী পুঙ্খানুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ আছে। বখতিয়ার বৌদ্ধধর্মকে সমূলে উৎপাটন করে ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষক-ছাত্রকে হত্যা, লাইব্রেরির হাজার হাজার বইয়ে আগুন, নালন্দার স্থাপনা ভাঙচুর ইত্যাদি হিংসাত্মক কাজ করেছে।

বাংলা উইকিপিডিয়াতে আছে:-
নালন্দা পৃথিবীর প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি এবং এটি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও একটি। এর স্বর্ণযুগে ১০,০০০ এর অধিক শিক্ষার্থী এবং ২,০০০ শিক্ষক এখানে জ্ঞান চর্চা করত। একটি প্রধান ফটক এবং সুউচ্চ দেয়ালঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপত্যের একটি মাস্টারপিস হিসেবে সুপরিচিত ছিল।বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি ভিন্ন ভিন্ন চত্বর(compound) এবং দশটি মন্দির ছিল; ছিল ধ্যান করার কক্ষ এবং শ্রেনীকক্ষ। প্রাঙ্গনে ছিল কতগুলো দীঘি ও উদ্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারটি ছিল একটি নয়তলা ভবন যেখানে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। তৎকালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই চর্চার সুযোগ থাকায় সুদূর কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য এবং তুরস্ক থেকে জ্ঞানী ও জ্ঞান পিপাসুরা এখানে ভীড় করতেন।[২] চীনের ট্যাং রাজবংশের রাজত্বকালে চৈনিক পরিব্রাজক জুয়ানঝাং ৭তম শতাব্দিতে নালন্দার বিস্তারিত বর্ণনা লিখে রেখে গেছেন।
আরবীয় আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের খুনে সৈনিক বখতিয়ার খিলজি বাংলাদেশের অনেক মুসলমানের কাছে বীর হিসেবে সম্মানিত। বাংলাদেশী মুসলমানদের কাছে জ্ঞানচর্চার পরিবেশের চাইতে অন্ধকার, বর্বরতা, অন্ধত্ব বেশি কাম্য। তারা কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে একটাও জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে পারেনি।

মুক্তমনা ওয়েবসাইটে "নালন্দার ধ্বংস বনাম ধর্মীয় বিজয়" শীর্ষক লেখাটি পড়ছিলাম। পড়তে গিয়ে তিন নং মন্তব্যের ঘরে একটি কবিতা পেলাম। লিখেছেন 'সেন্টু ঠিকাদার'। কবিতাটি ভাল লেগেছে, তাই এই ব্লগে লিঙ্ক স্বীকার করে রেখে দিলাম।
কোথায় সেই তক্ষশীলা
আর কোথায় সেই নালন্দা,
কোথায় সুশীতল শাল বনে
ঢাকা প্রশান্তির সেই বিহার।
কোথায় সেই সারগর্ভ বাণী
আর আকাট্য জ্ঞান।
কোথায় আমাদের সেই
বিশ্ব শান্তির বাণীময় পূর্বজরা।
শুধু ভেবে এতেই পাই শান্তি যে
তাহাদের সেই লোহিত কণিকা
হায় বইছে আমাদেরই ধমনীতে,
যুগে যুগে নিস্তেজ বা নিস্প্রাণ,
জাতপাতের আঘাতে মূমূর্ষ হয়ে।

কবির অনুভূতির গভীরতা মন ছুঁয়ে যায়। হাজার বছরের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস রক্তের কণায় আড়মোড়া ভাঙে। অতীত ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে

1 comments:

রাবেয়া said...

নালন্দার ইতিহাস জানি। মুসলমানরা জ্ঞানকে কতটা ভয় পায়- এই ঘটনা তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। এই জন্যই মুসলমানরা এই পৃথিবীতে র্ববর জাতি হিসেবে পরিচিত।

Post a Comment

 

Blog Archive

© 2012-2017 আমার ইতিহাস | Powered by: Blogger