বিশ্ব সভ্যতার সুতিকাগার ভারতবর্ষ
বিখ্যাত শাসক হারুন অর রশিদ তার শাসনামলে বাগদাদ শহরে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। তার পুত্র আল-মামুনের শাসনকালে (৭৮৩-৮৩৩) এর কার্যপরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এর নাম ছিল জ্ঞানগৃহ (House of wisdom)। এখানে পন্ডিতেরা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বই পড়তে, আলোচনা করতে এবং নিজ নিজ চিন্তা-চেতনা প্রকাশ করার জন্য আসতেন। বাদশা আল-মামুন একদল অনুবাদককে গ্রিক, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষার বইপত্রকে আরবি ভাষায় রূপান্তরের কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। এইটুকু তথ্য জেনে একজন পাঠক ভেবে বসতে পারেন যে, আরবিয় জ্ঞানরাজ্য গ্রিক, পারস্য ও হিন্দু সংস্কৃতির জ্ঞান দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তিনি যদি আর একটু গভীরে অনুসন্ধান করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, গ্রিক, পারসিয় এবং মেসোপটেমিয় সভ্যতার রচয়িতা ব্যক্তিগণ আসলে ভারতবর্ষ থেকেই সেখানে গিয়ে অভিবাসী হয়েছিলেন।
বর্তমানকালের ইরানের পুরনো নাম পারস্য। এটা জেনে অবাক হবেন যে এই নামটি এসেছে বিষ্ণুর অবতার পরশুরামের কুঠারের নাম 'পরশু' থেকে। পন্ডিতেরা বিশ্বাস করেন যে, কোন এক সময়ে পরশুরামের নেতৃত্বে একদল মানুষ বর্তমানকালের ইরান এলাকায় গিয়েছিল ও সেখানে বসবাস করা শুরু করেছিল। পাঠক অবাক হয়ে যাবেন এটা জেনে যে বর্তমান 'ইরাক' নামটির উৎস একটি সংস্কৃত শব্দ 'অর্ক' যার অর্থ সূর্য। প্রথমে অর্ক শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে 'অরক', এরপর 'অরক' পরিণত হয়েছে 'ইরাক' শব্দে।
মিশরে নীল উপত্যকার পাশের সমতলভূমিতে অবস্থিত একটি শহর তেল-আল-অমরন। এখানে ১৪৬০ খ্রিষ্টপূর্বের একটি পাথরখণ্ড পাওয়া গেছে। এতে লেখা আছে ইউফ্রেটিস নদীর উজানের এলাকা মিটনি রাজবংশের রাজা শাসন করতো। এই জায়গাটি ব্যাবিলোনিয় ও মেসোপটেমিয় মানুষ দ্বারা ভর্তি ছিল। মিটনি রাজবংশের রাজাদের নামগুলো সংস্কৃত বা হিন্দু নামের ছিল। যেমন দুসরভ্যত্য, সুস্তর্ণ, দুস্তর্ণ, অর্ততর্মা ইত্যাদি। মিশরের রাজা আমেনোফিস (৩য়) এবং আমেনোফিস (৪র্থ) এর সময়ে রাজা দুসরত্য বেঁচে ছিলেন। এই মিটনি রাজারা আর্যদেবতা যেমন ইন্দ্র, বরুন, নাসাত্মা প্রমুখের পূজা করতো। এই উদাহরণগুলো এটাই প্রমাণ করে যে ভারত থেকে অভিবাসী মানুষেরাই ব্যাবিলন ও মেসোপটেমিয় সভ্যতা তৈরি করেছে।
সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হল যে ভারত থেকে আসা হিন্দুদের হাতেই রূপ লাভ করেছে গ্রিক সভ্যতা। পণ্ডিতগণ এখন এটা বিশ্বাস করেন যে, 'গ্রিক' শব্দটি সংস্কৃত 'গৃহ' বা 'রাজগৃহ' শব্দ থেকে এসেছে। বর্তমান ভারতের বিহারের একটি জায়গার নাম 'রাজগীর'। পণ্ডিতেরা মনে করেন রাজগীর থেকে একদল মানুষ বর্তমান গ্রিস এলাকায় আসেন এবং বসতি গড়ে তোলেন। যারা 'মগধ' থেকে গিয়েছে, তাদেরকে গ্রিসে 'মগধান' বলা হত। সময়ান্তরে এই 'মগধান' শব্দটি রূপান্তরিত হয়ে 'মেকেদান' বা 'মেসেদান' হয়েছে। শেষে এই শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে 'মেসিডোনিয়া' শব্দে পরিণত হয়েছে। এই জায়গাটি গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের জন্মস্থান। অতুলনীয় সৌন্দর্যের মানুষকে সংস্কৃতে 'অলোকাসুন্দর' বলে। কাল পরিক্রমায় 'অলোকসুন্দর' শব্দটি বিবেচিত হয়ে 'আলেক্সান্ডার' শব্দের রূপ লাভ করেছে।
আফগানিস্তানের হাম্মান এলাকায় ভীলগোত্রের মানুষ বাস করতো। এরা যখন গ্রিসে যায়, তখন সেখানে তাদের গোত্রপতির নাম হয় 'ভীলপস'। এই শব্দটি 'ভীলপতি' শব্দের পরিবর্তির রূপ। 'ভীলপস' শব্দটি পরবর্তিতে রূপান্তরিত হয়ে 'ফিলিপস' রূপ গ্রহণ করেছে। আর এই গোত্রেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্রিক বীর আলেকজান্ডার।
অযোধ্যা থেকে অভিবাসী হওয়া মানুষরা গ্রিসে 'অযোধ্যান' (অযোধ্যার মানুষ) হিসেবে অভিহিত হতেন। এই 'অযোধ্যান' পরিবর্তিত হয়ে 'আয়োনান' শব্দে পরিণত হয়। আয়োনীয়ান দ্বীপ, আয়োনীয় সাগর এই নামের উত্তরাধিকার বহন করছে। 'ইন্দু' নদীর গা ঘেষে এক ছোট বসতি ছিল। নাম তার 'অটক' (Attak)। জায়গাটি আরব সাগরের ৯৪২ মাইল উত্তরে অবস্থিত। এই অঞ্চলের মানুষরা গ্রিসে গিয়ে যেখানে বসতি গেড়েছিল সে জায়গার নাম রেখেছিল 'অটকস্থান'। এই শব্দ পরিবর্তিত হয়ে 'অটকথান', 'এথেন' ইত্যাদি শব্দে রূপান্তরিত হয়। পরে তা 'এথেনস' রূপ লাভ করে। আর এটাই গ্রিসের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী, গৌরবময় একটি শহর।
গ্রিসের আর একটি শহরের নাম স্পার্টা। একই নামে জাতিগোষ্ঠীর লোকেদের সাহস ও বীরত্বের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। স্পার্টা শব্দটি যে সংস্কৃত স্পর্ধা শব্দের পরিবর্তিত রূপ একথা মেনে নিতে পণ্ডিতদের এখন আর কোন দ্বিধা নেই।
ইউরোপ (Europe) শব্দটি যে সংস্কৃত শব্দ 'সুরূপা (Surupa) শব্দের বিকৃত রূপ, সে বিষয়ে পন্ডিতের এখন একমত হয়েছেন। দেবকী'র সন্তান ভগবান কৃষ্ণ গ্রিসে গিয়ে 'এপোলো' নামে পরিচিত হয়েছেন। কৃষ্ণের আরেক নাম 'রাধাকান্ত'। রাধা যেহেতু একজন নারী ও অবলা, তাই কৃষ্ণের আরেক নাম অবলাকান্ত (Abalakanta)। 'অবলা' শব্দটি গ্রিসে গিয়ে এপোলো (Apollo) শব্দে পরিবর্তিত হয়েছে। কৈলাস (Kailash)বাসী দেবাদিদেব মহাদেব শিব (Shiva) গ্রিসে গিয়ে দেবরাজ 'জিয়ুস' রূপ লাভ করেছেন। সংস্কৃত শব্দ আর্য (Arya) শব্দটি গ্রিক ভাষায় এরিস্টো (Aristo) হয়ে গিয়েছে। এই শব্দটি ধীরে ধীরে পরিবর্তি হয়ে এরিস্টোক্রাট (Aristocrat), এরিস্টোক্রাসি (Aristocracy) ইত্যাদি শব্দের জন্ম দেয়।
শুধুমাত্র গ্রিস নয়, ইউরোপের অন্যান্য স্থানেও সংস্কৃত শব্দের প্রভাব আছে। নরওয়ে ও সুইডেন দেশদুটোকে একসাথে 'স্ক্যান্ডিনেভিয়া' বলে। এটা সবাই জানে যে কার্তিকের আরেক নাম 'স্কন্দ'। কোন এক সময় এই এলাকার শাসক ছিলেন স্কন্দ। আর তার নামেই এলাকার নাম হয় 'স্ক্যান্ডিনেভিয়া'। পণ্ডিতেরা নিশ্চিত যে সংস্কৃত 'স্কন্দনাভি' শব্দ থেকে আজকের 'স্ক্যান্ডিনেভিয়া' শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। ঋষি 'কাশ্যপ' এর নামে নামকরণ করা হয়েছে 'কাস্পিয়ান' সাগরের। ঋষি 'অগ্যস্ত' এর নামের বিকৃত রূপ হল আগস্ট, অগাস্টিন, অগাস্টাস প্রভৃতি। 'ইন্দ্র' শব্দ পরিবর্তি হয়েছে এন্ড্রু, এন্ড্রুস প্রভৃতি শব্দে।
মার্ক টোয়েন বলেছেন- "মানস সভ্যতার সুতিকাগার হল ভারত। মানবীয় জ্ঞানের জন্মস্থান, ইতিহাসের মাতা, ঐতিহ্যের মাতামহ। মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান ও সবচাইতে বিস্তৃত উপাদান শুধু ভারতবর্ষেই পাওয়া গেছে।"
লিংক

0 comments:
Post a Comment