আমরা আগের আলোচনা থেকে জানতে পারলাম যে, মুসলিম অনুবাদকরা যে গ্রিক এবং পারস্যের পান্ডুলিপিগুলো অনুবাদ করে নিজেদের জ্ঞানরাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, তা আসলে বিশ্ব সভ্যতার সুতিকাগার হিন্দু প্রজ্ঞা প্রভাবিত ভারতীয় জ্ঞানরাজ্যের একাংশ মাত্র।
জ্যামিতির যে সূত্রটি গ্রিক পন্ডিত পিথাগোরাসের সূত্র বলে পরিচিত তাকে এখন অনেকে পিথাগোরাসের সময়ের শতাধিক বৎসর আগে বৌতায়ন/বৌধায়নমুনি এই সূত্রটি তার 'সুল্বসূত্র' গ্রন্থে লিখে রেখেছিলেন বলে বিশ্বাস করে। বৌধায়ন ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মানুষ। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এই 'পিথাগোরাস' শব্দের বুৎপত্তি জেনে নেয়া যাক। স্কুল শিক্ষককে সংস্কৃত ভাষায় বিদ্যাপীঠগুরু বলা হয়। সময়ান্তরে গ্রিক ভাষায় এই শব্দ রূপান্তরিত হয়ে পরিণত হয় পীঠগুরু। এই পীঠগুরু শব্দটি পরে 'পিথাগোরাস' শব্দে পরিবর্তিত হয়ে স্থায়ী রূপ লাভ করে।
হিন্দু সংখ্যা ও সংখ্যা লেখার চিহ্নগুলো বৃহৎ থেকে বৃহত্তর এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিমাণকে শুধুমাত্র ৯টি চিহ্ন, একটি শূন্য এবং একটি বিন্দু চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করতে পারে। সংখ্যাতাত্ত্বিক এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন প্রাচীন ভারতীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ঋষিগণ। ইউরোপীয়রা এই দশমিক পদ্ধতিটিকে অজ্ঞতাবশত আরবিয় পদ্ধতি বলে ভুল করেছিল। তাই তারা এর নাম দেয় আরবিয় সংখ্যা। এই দশমিক পদ্ধতিতে যদি কোন সংখ্যা দশ দ্বারা গুণ করা হয়, তাহলে সংখ্যাটি তার পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে বামপাশে একঘর সরে যাবে; যদি একশত দিয়ে গুন করা হয়, তাহলে বামপাশে দুইঘর সরে যাবে। একইভাবে যদি সংখ্যাটিকে দশ দিয়ে ভাগ করা হয়, তাহলে সংখ্যাটি ডানপাশে একঘর সরে যাবে; যদি একশত দিয়ে ভাগ করা হয়, তাহলে দুইঘর ডানে সরে যাবে। এই পদ্ধতিটিকেই বলে দশমিক পদ্ধতি। ব্যাবিলনে ষাট (৬০)'কে একক ধরে গণনার যে পদ্ধতি ছিল তা এখনো কোন ও সময় মাপার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ষাট সেকেন্ডে হয় এক মিনিট এবং ষাট মিনিটে হয় এক ডিগ্রি বা এক ঘন্টা।
একটি প্রশ্ন স্বভাবতই দাড়িয়ে যায়। কে এবং কখন এই হিন্দু গাণিতিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। অনেকের ধারণা যে, বিখ্যাত গণিতবিদ, মহাকাশবিদ এবং বিজ্ঞানী 'আর্যভট্ট' এই হিন্দু গণিত পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু এই বহুল প্রচারিত তথ্যটি মনে হয় সঠিক নয়। শ্রী ভারতী কৃষ্ণ তীর্থজী (১৮৮৪-১৯৬০) বেদের সুক্তসমূহ ১৯১১ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্লেষণ করে প্রাচীন ভারতীয় গণিততত্ত্ব পুনরায় আবিষ্কার করেছেন। বৈদিক কালে এই পদ্ধতির সমৃদ্ধি ঘটেছিল। ঠিক কখন এবং কার হাতে এই পদ্ধতির আবিষ্কার হয়েছিল তা বর্তমানকালে এসে নির্দিষ্টভাবে বের করা কঠিন। তবে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতি দশটি হিন্দু সংখ্যা ব্যবহার করত। এর সমর্থনে ষোলটি সূত্র বা শব্দসূত্র/ বিধান পাওয়া গেছে। এগুলো দিয়ে যে কেউ পাটিগণিতের কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারবে। যেমন কোন রকম কাগজ ও কালির সাহায্য ছাড়া একটি আট অংকের সংখ্যাকে ছয় অংকের সংখ্যা দিয়ে মনে মনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গুণ করা যে কারও পক্ষে সম্ভব। এই পদ্ধতিতে মন নিজের গতিতে কাজ করে। এই পদ্ধতির সাহায্যে ছাত্রকে সমাধানের সঠিক পদ্ধতির দিকে নিয়ে যাওয়া সহজ। তবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যে দশমিক পদ্ধতি ছাড়া পাটিগণিতের এত সরলীকরণ কোনক্রমেই সম্ভব ছিল না।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকালে হরপ্পা সভ্যতার দশমিক পদ্ধতির প্রচলন ছিল। হরপ্পা সভ্যতা ও সংস্কৃতির একজন বিশ্লেষক বলেছেন যে দশমিক পদ্ধতিতে ভাগ করা ওজন পরিমাপকের ব্যবহার তারা চিহ্নিত করেছেন। এগুলো ০.০৫, ০.১, ০.২, ০.৫, ১, ২, ৫, ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০ এবং ৫০০ – তে বিভক্ত ছিল। হরপ্পার ওজন পরিমাপের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তার বিস্ময়কর নির্ভুলতা। হিন্দু সংখ্যাবিজ্ঞানের প্রাচীন সীমা পরিমাপ করা সত্যিই কঠিন।
সূত্র: Dr Radhasyam Brahmachari এর How Muslims carried Hindu Wisdom to the West, Part 2। লিংক
Sunday, August 26, 2012
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

0 comments:
Post a Comment