সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশের কিছু তরুণ ১ (এক) মার্চ ২০১২ তারিখে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কেউ কেউ এতে সমর্থন করে ফেসবুক এবং বিভিন্ন ব্লগসাইটগুলোতে এটা নিয়ে বেশ মাতামাতি করেছেন। বিষয়টা আমার কাছে কেমন যেন লাগল। কয়েকদিন আগে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী চোরাচালানী হত্যার প্রতিবাদে ভারতীয় সাইট হ্যাক করার উৎসব পালন করল বাংলাদেশী হ্যাকাররা, এখন আবার শুরু হয়েছে ভারতীয় পণ্য বর্জনের দিবস পালন। এই ধরণের কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে কি নিয়ে আসবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না, তবে আমার কাছে এটা খুব একটা আশাপ্রদ মনে হচ্ছে না। ভারতীয়দের বিরুদ্ধে আমাদের অনেক অভিযোগ। কিন্তু তারা তাদের দেশ নিয়ে কিরূপ ভাবে? এটা যদি প্রশ্ন করি, তাহলে আমার মনে হয় সকল ভারতীয় একবাক্যে বলবে যে তাদের প্রধান সম্পদ হল তাদের দেশপ্রেম। আমাদের দেশের মানুষের কিন্তু এই জিনিসটার বড়ই অভাব। আমাদের দেশের কোন ব্যক্তিটি দেশটাকে সত্যিকারের ভালবাসে, তা হ্যারিকেন দিয়ে খুঁজে দেখতে হয়। যদি দু'একজনকে পাওয়া যায়, তাহলেও দেখা যাবে যে দেশপ্রেমের সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের মধ্যে মতভেদ আছে। আমরা শংকর জাতি। তাই কোন বিষয়েই আমরা একমত হই না। ভিন্নমত থাকেই। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। সেই বিষয়গুলো কি কি? তা নিয়েও আমাদের মধ্যে মতভেদ প্রচুর। কয়েকমাস আগে সৌদী আরবের সরকার বিনাবিচারে বাংলাদেশী শ্রমিকদেরকে গলা কেটে খুন করল। পাকিস্তান আমাদের দেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পর থেকেই বিরোধীতা করে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলো বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে একটাকাও ব্যয় করে না। তারা বাংলাদেশে শুধু মসজিদ তৈরি করার জন্য টাকা দেয়। দেশের একটা রাস্তা, ব্রিজ বা স্কুলের উন্নয়নে মুসলিম ধনীদেশগুলো কোন টাকা দেয় না। দেশের শিশুদের জন্য বিদ্যালয় বা শিক্ষা উপকরণ তৈরিতেও তারা সামান্যতম আগ্রহী নয়। তারা বরং এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টাকা দেয় যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাদের দেশের সংস্কৃতির গুণগান গাইবে, প্রয়োজনে অন্য মানুষকে খুন করবে, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার দিকেই তাদের যত আগ্রহ। কিন্তু এই সব বিষয়ে বাংলাদেশের সচেতন দেশপ্রেমিক তরুণ সমাজের কোন মাথাব্যথা নেই। জামাত-শিবির যেমন ভারতের নাম শুনলে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। ভারতের একটু ক্ষতি করা মানেই হিন্দুদের ক্ষতি করা বলে মনে করে। সাম্প্রতিক ভারতীয় পণ্য বর্জনের যে ডাক সেখানেও আমি একই গন্ধ পাচ্ছি। বেশিরভাগ সাধারণ তরুণ হয়তো এতকিছু ভাবছে না। তারা হয়তো ভারতবিরোধী তথা হিন্দুবিরোধীদের অপপ্রচারের শিকার, কিন্তু এর ফলে ক্ষতিটা কার হবে? বাংলাদেশের সীমান্তে যারা মারা যায়, তারা বেশিরভাগই চোরাচালানী। বন্ধুর কাছে শুনলাম, একটা ফ্লাগ মিটিংযে বিএসএফ এর দলনেতা বলেছেন, তারা যদি এক সপ্তাহ গোলাগুলি বন্ধ রাখে, তাহলে চোরাচালানীরা কাঁটাতারের বেড়া বেশ কয়েক জায়গায় কেটে ফেলে। এটা ভারতীয় বা বাংলাদেশী যে কোন দেশের চোরাচালানীদের কাজ হতে পারে। বিএসএফদের কাজই হচ্ছে সীমান্ত রক্ষা করা। সেখানে যদি অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকে তাহলে তাদের গুলি না চালিয়ে আর কিই বা করার থাকে। আমার কাছে দুপক্ষের যুক্তিই সমান গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। কোন কোন প্রবাসী (বিদেশী বাঙালি) মন্তব্য করেছেন যে বিশ্বের অন্য কোন দেশের সীমান্তে এত মানুষ গুলি খেয়ে মারা যায় না। কথাটি সঠিক বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু সেইসাথে জানতে চাই, আর কোন দেশের সীমান্তে এত চোরাচালান হয় কি?
বাংলাদেশী যেসব ফেসবুক এবং ব্লগ ব্যবহারকারী ভারতীয় পন্য বর্জনের নামে ভারত বিরোধীদের দ্বারা ব্যবহৃত হলেন, তাদেরকে প্রশ্ন করি, আপনারা কি বাংলাদেশের চোরাচালানীদেরকে ভারতীয় পণ্য চোরাচালান না করার আহ্বান জানাবেন? বিদেশী পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা খুবই গর্বের ব্যাপার। এমন হলে তো ভালই। প্রবাসীদেরকে (বাঙালি বিদেশী নাগরিক) বলি, আপনারা বিদেশের সৎ, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন সমাজে বাস করে নিজেরাও সৎ, পরিচ্ছন্ন মানসিকতার অধিকারী হয়েছেন। বাংলাদেশের জটিলতা, কুটিলতা কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে, তা হয়তো আপনারা বুঝতে পারছেন না। আপনারা দয়া করে বিদেশের সুবিধাগুলো ত্যাগ করে বাংলাদেশে চলে আসুন। দেশের সমস্যাগুলোকে আমাদের মত নিজের কাঁধে তুলে নিন। আদর্শের কথা আমাদের কাছে কতটা অন্তসারশূন্য ঠেকে, তা বুঝতে পারবেন।
গত ১ মার্চ ২০১২ তারিখে ভারতীয় মোবাইল এয়ারটেল বর্জনের আহ্বান দেয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশী অনেকে হয়ত তা পালন করেছে। এয়ারটেল ব্যবহার না করে তারা হয়তো অন্য অপারেটর ব্যবহার করেছে। যদি তিনি বাংলালিংক বা গ্রামীণফোন ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তার কাছে প্রশ্ন রাখি যে মিসর এবং ফিনল্যান্ডের কোম্পানীকে টাকা দেয়ার কারণ কি? তারা আপনার কি এমন উপকার করেছে যে তাদের সীম ব্যবহার করছেন? গ্রামীণ ফোন সবচাইতে বেশি টাকা কলরেট হিসেবে নেয়। তারা ভিওআইপির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিলিয়ন টাকা চুরি করেছে, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছে, বাংলাদেশকে ঠকিয়েছে। এ বিষয়ে আপনি কি কোন প্রতিবাদ করার কথা ভেবেছেন? নাকি দেশটা ইউরোপীয় বলে নগ্ন আত্মসমর্পণকেই শ্রেয় বলে মেনে নিয়েছেন। মিসর কি মুসলিম দেশ বলে তার প্রতি আপনার কোন পক্ষপাত আছে?
আসলে প্রশ্ন করলে অনেক রকমের করা যায়। কিন্তু আমি বলতে চাই যে কথা, আসুন - দেশের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করুন। সকল বিদেশী পন্য বর্জন করুন। আমেরিকা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে অব্যাহত ভাইয়াগিরি চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের তৈরি কম্পিউটারসহ সবরকমের যন্ত্রাংশ বর্জন করি। জাপান শুকর খায়, কুকুর খায়, যা মুসলিম দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। আসুন আমরা জাপানের কাছ থেকে ভিক্ষা নেয়া বন্ধ করি। ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমাদের দেশকে সবসময় ধমকের নিচে রাখে, তাদের সবরকমের উন্নয়ন কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান করি। যতদিন আমরা নিজেরা যন্ত্রপাতি তৈরি করতে পারছি না, ততদিন না হয় মোটা ভাত-মোটা কাপড়ই আমরা মাথা পেতে নেব। দরকার পড়লে গরুর গাড়িতে যাতায়াত করব (ও হো ভারতীয় গরু ছাড়া তো আমাদের ঈদ হয়না, আসুন আগামী ঈদে ভারতীয় গরু বর্জন করি)। এরকম আত্মসম্মানবোধ যদি এখনও আমরা নিজের ভেতরে বোধ না করি, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের নীতিবোধে নিশ্চয় বড় রকমের গলদ আছে, নিশ্চয় আমরা কোন ভুল করছি, যার মাশুল আমাদেরকেই দিতে হবে।
Friday, March 2, 2012
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

2 comments:
কিন্তু চোরাচালান রোধে গুলি গুলি চালাতেই হবে কেনো ? তাদেরকে আটক করে বিচারে আনা যায়
আর ফেলানি নামের মেয়েটিকে কাঁটা তারের বেড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় গুলি করে বিএসএফ সেই কিশোরীটি তো কনো চোরাচালানকারি ছিলোনা
কেউ যদি অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে সিমান্ত পারি দেয় বা সিমান্ত দিয়ে চোরাচালান করে তাদেরকে আটক করা যায় তার মানে তো এইনা যে কাউকে এভাবে বিচারবিহীন গুলি করে মেরে ফেলতে হবে আপনার এই পোষ্টের সবগুলো কথাতে একমত তবে সিমান্তে ভারতীয় বিএফএর এভাবে নিরবিচারে গুলি করে হত্যা এটা কনোভাবে সমর্থন করা যায়না
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে চোরাচালান রোধে গুলি চালানোটা আপত্তিকর। কিন্তু কারও প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়েই আপনি ভাবুন, আপনি যদি সীমান্তরক্ষী হতেন তাহলে কি করতেন। রাতের অন্ধকারে কোন ঝোপের আড়ালে শব্দ হচ্ছে, চ্যালেঞ্জ করলে দৌড়ে পালাচ্ছে, কিংবা দূর থেকে দেখা যাচ্ছে যে কেউ মাল পাচার করছে তাদেরকে কি ধাওয়া দিয়ে ধরা সম্ভব? ফেলানির ব্যাপারটা খুব মর্মান্তিক। কিন্তু দেখুন, সে কাঁটাতারের বেড়া কিভাবে পার হচ্ছিল। সে কি স্বাভাবিক আইনসম্মতভাবে বর্ডার পার হতে পারতো না? আসলে আমি অন্যকে দোষ দেয়ার আগে নিজের দোষের কথা ভাবতে চাই। আমরা তাদেরকে গুলি করার সুযোগ দেব কেন? আমরা চোরাচালানী না হলেও চোরের মত আচরণ করব কেন?
Post a Comment