'হুযুর কেবলা' (হুজুর কেবলা নাটক) গল্পের মূল কাহিনী সংক্ষেপে নিচে উল্লেখ করলাম (ঊর্ধকমার মধ্যে থাকা বাক্যগুলো গল্প থেকে হুবহু নেয়া)। সম্পূর্ণ পড়ার পর আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন সাতক্ষীরার মুসল্লি সমাজ (পত্রিকার ভাষায় স্থানীয় জনগণ) নাট্যকার ও নাটক সংশ্লিষ্ট মানুষদের উপর ক্ষেপে গিয়েছিল কেন? কেন তারা হিন্দু বাড়িগুলোতে আক্রমণ করে সবকিছু ভেঙেচুরে লুটতরাজ করে ধ্বংস করেছিল?
############
এমদাদ ইংরেজি শিক্ষিত, দর্শনে অনার্স করা ছেলে। দর্শন পড়ার কারণে বিভিন্ন ধর্ম-দর্শন সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখত। "সে ধর্ম, খোদা, রসুল কিছুই মানিত না। সে খোদার আরশ, ফেরেশতা, ওহী, হযরতের মেয়ারাজ লইয়া সর্বদা হাসিঠাট্টা করিত। কলেজ ম্যাগাজিনে সে মিল, হিউম, স্পেন্সার, কোমতের ভাব চুরি করিয়া অনেকবার খোদার অস্তিত্বের অসারতা প্রমাণ করিয়াছিল"। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সেই সময়ে দেশজুড়ে শুরু হওয়া বিলিতি পণ্য বর্জনের ডাকে সেও সাড়া দেয়। বিলিতি পণ্য বর্জন করে দেশি পোষাক পড়া শুরু করে। ফলে জনগণ তাকে সম্মানের চোখে দেখা শুরু করে। এমদাদ মনে মনে বুঝল- "কলিযুগেও দুনিয়ায় ধর্ম আছে।" তাই সে ধীরে ধীরে ধর্মচর্চার দিকে ঝুঁকে পরে। কিন্তু মনে শান্তি পায় না। "সে স্থানীয় কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটির সেক্রেটারি ছিল। সেখানে প্রত্যহ সকালে বিকালে চারপাশের বহু মাওলানা-মওলবী সমবেত হইয়া কাবুলের আমিরের ভারত আক্রমণের কতদিন বাকী আছে, তার হিসাব করিতেন এবং খেলাফত নোট বিক্রয় লব্ধ পয়সায় প্রত্যহ পান ও যরদা এবং সময় সময় নাশতা খাইতেন।"এই সভায় একজন সুফী সাহেব আসতেন। তার কাছে এমদাদ মনের অশান্তির কথা বলেন। সুফী সাহেব যখন জানলেন যে এমদাদ কোন পীরের মুরিদ হয়নি, তখন বললেন: "হুম, তাই বলুন। গোড়াতেই গলৎ। পীর না ধরিয়া কি কেহ রুহানিয়ত হাসেল করিতে পারে? হাদিস শরিফে আসিয়াছে (এইখানে সুফী সাহেব বিশুদ্ধরূপে আইন-গাইনের উচ্চারণ করিয়া কিছু আরবী আবৃত্তি করিলেন এবং উর্দুতে তার মানে-মতলব বয়ান করিয়া অবশেষে বাঙলায় বলিলেন): জযবা ও সলুক খতম করিয়া ফানা ও বাক্য লাভে সমর্থ হইয়াছেন এইরূপ কামেল ও মোকাম্মেল, সালেক ও মজযুব পীরের দামন না ধরিয়া কেহ যমিরের রওশনী ও রুহের তরক্কী হাসেল করিতে পারে না।"
সূফী সাহেবের হাত ধরে এমদাদ এক কামেল ও মোকাম্মেল, সালেক ও মজযুব পীর সাহেবের মুরিদ হলেন। এই পীর সাহেব মানুষের গোপন কথা বলে দিতে পারেন। তিনি এমদাদকে মুরিদ এই পথে আসতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছেনঃ "বাবা, সংসার ছাড়িয়া থাকিতে পারিবে না, তাসাউওয়াফ বড় কঠিন জিনিস। কিন্তু এমদাদ তাওয়াজ্জোহ লইল।"
পীর সাহেব নিজের লতিফার যেকের জারি করে সেই যেকের এমদাদের লতিফায় নিক্ষেপ করেন। ফলে এমদাদ সারাদিন দুই চোখ বন্ধ করে 'এলহু' এলহু' করতে লাগল। পীর সাহেব বলেছিলেনঃ "খেলওয়াৎ-দর-আঞ্জুমান দ্বারা নিজের কলবকে স্বীয় লতিফার দিকে মুতাওয়াজ্জাহ করিতে পারিলে তার কলবে যাতে-আহাদিয়তের ফয়েয হাসেল হইবে এবং তার রূহ ঘড়ির কাঁটার ন্যায় কাঁপিতে থাকিবে।" এমদাদ অনেক কষ্টেও তার কলবকে লতিফার মুতাওয়াজ্জাহ করতে পারলো না।
একবার পীর সাহেবকে দূরের মুরিদগণ দাওয়াত করল। কোলকাতার সংবাদপত্রে ইংরেজিতে পীরসাহেবের ভ্রমণবৃত্তান্ত লেখার জন্য এমদাদকেও সাথে নেয়া হল। প্রতিদিন বিভিন্ন বাড়িতে বিরাট ভোজ চলতে লাগল। এমদাদ দেখল পীর সাহেব খেতেও পারেন প্রচুর। সন্ধ্যায় পুরুষদের জন্য মজলিস বসত। রাতে এশার নামাযের পর অন্দরমহলে মেয়েদের জন্য ওয়ায হত। সেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। ওয়ায করার সময় রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমন সম্বন্ধে পীর সাহেব খুব উচু ধারণা পোষন করতেন। তিনি বলতেনঃ "তাসাউওয়াফের বাতেনী কথা বুঝিবার ক্ষমতা এই মেয়েটার মধ্যেই কিছু আছে। ভাল করিয়া তাওয়াজ্জোহ দিলে তাকে আবেদা রাবেয়ার দরজায় পৌঁছাইয়া দেওয়া যাইতে পারে।" এই জায়গায় লেখক আবুল মনসুর আহমদ মন্তব্য করেছেন "এশার নামাযের পর দাড়িতে চিরুনি ও কাপড়ে আতর লাগান সুন্নত এবং পীর সাহেব সুন্নতের একজন বড় মো'তেকাদ ছিলেন।" আরও একটু বই থেকে উল্লেখ করি। "ওয়ায করিবার সময় পীর সাহেবের প্রায়ই জযবা আসিত। সে জযবাকে মুরিদগণ 'ফানাফিল্লাহ' বলিত।
এই 'ফানাফিল্লাহ'র সময় পীরসাহেব 'জ্বলিয়া গেলাম', 'পুড়িয়া গেলাম' বলিয়া চীৎকার করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িতেন। এই সময় পীর সাহেবের রূহ আলমে-খালক হইতে আলমে-আমরে পৌঁছিয়া রূহে-ইযদানীর সঙ্গে ফানা হইয়া যাইত এবং নূরে-ইযদানী তাঁর চোখের উপর আসিয়া পড়িত। কিন্তু সে নূরের জলওয়া পীর সাহেবের চক্ষে সহ্য হইত না বলিয়া তিনি এইরূপ চিৎকার করিতেন।
তাই জযবার সময় একখন্ড কালো মখমল দিয়া পীর সাহেবের চোখ-মুখ ঢাকিয়া দিয়া তাঁর হাত-পা টিপিয়া দিবার ওসিয়ত ছিল।
এইরূপ জযবা পীর সাহেবের প্রায়ই হইত।
----এবং মেয়েদর সামনে ওয়ায করিবার সময়েই একটু বেশি হইত।
এই সব ব্যাপারে এমদাদের মনে একটু খটকার সৃষ্টি হইল।"
তারপরও এমদাদ জোর করে মনের ভক্তি ও বিশ্বাস ধরে রেখেছিল। এরমধ্যে পীর সাহেব ও প্রধান খলিফা সুফী বদরুদ্দীন সাহেবকে নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে কথা বলা সে দেখেছিল। তার মনে সন্দেহ ছায়াপাত করল।
বেশ কয়েকদিন মুরিদদে বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খাওয়া শেষে পীর সাহেব ফিরে যেতে চাইলে তার ভক্তরা শোকাক্রান্ত হয়ে পরে। জনৈক সাগরেদ সুফী সাহেবের ইশারায় পীর সাহেবকে বলে যে তিনি গ্রামবাসীকে তার কেরামতে নেসবতে-বায়নান্নাস দেখাতে চেয়েছিলেন। পীর সাহেব প্রথমে অসম্মত হলেও জনৈক মাওলানা তার মুরিদদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জানালে তিনি রাজি হন। সে রাতেই কেরামতি দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়।
কোন একজনের শরীরে অন্য জনের আত্মা আনানোর কেরামতি শুরু হয় রাতের মৌলুদ মহফেল শেষে খানাপিনার পর। পীর সাহেব যে মোরাকেবার তরকিব দেখাবেন তার জন্য একজন মাধ্যম দরকার যার উপর আত্মা নামানো হবে। প্লানচেট আরকি। তিনি যে কোন একজনকে মোরাকেবায় বসতে ডাকেন। কারও সাহস হয়না। এমদাদ বসতে চাইলে পীর সাহেব বলেনঃ "বাবা, মোরাকেবা অত সহজ নয়। তুই আজিও যেকরে-খফী আমল করিস নাই, মোরাকেবায় বসিতে চাস?" বলে এমন অট্টহাসি দিলেন যে সবাই হেসে উঠল। লজ্জ্বায় এমদাদের রাগ হলেও সে বসে পড়ল। শেষে প্রধান খলিফা সুফী সাহেব আমতা আমতা করে রাজী হলেন। কার আত্মা নামানো হবে প্রশ্ন করলে জনৈক শাগরেদ বললেনঃ "এইমাত্র মৌলুদ শরিফ হইয়াছে; হযরত পয়গম্বর সাহেবের মোয়াজেযা বয়ান হইয়াছে। তাঁরই রূহ আনা হোক।"
যথারীতি সুফী সাহেবের চোখে-মুখে-শরীরে নানারকম ফু দেয়া হল। নানা প্রকার দোয়া-কালাম পড়া হল। কিছুক্ষণ পর সুফী সাহেব সমস্ত শরীর কাঁপাতে কাঁপাতে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে, হাত পা ছুড়তে ছুড়তে অজ্ঞান হয়ে গেল। হযরতের রূহপাক আসার পর যার সিনা সাফ তেমন ব্যক্তিকে প্রশ্ন করতে বলা হল। গ্রামবাসী ভয়ে এগোল না। এমদাদ এগিয়ে সালাম দিল। কিন্তু সুফী সাহেবের শরীরে ভর করা নবি মোহাম্মদের রূহ কোন কথা বলল না। পীর সাহেবের অন্যতম খলিফা মাওলানা বেলায়েতপুরী সাহেব প্রশ্ন করলেনঃ "আমাদের পীর দস্তগির কেবলা সাহেব নূরে-ইযদানীর জলওয়া সহ্য করিতে পারেন না, ইহার কারণ কি?" পীর সাহেব তার পঞ্চাশ বৎসরের রঞ্জকশি পন্ড হওয়ার ভয়ে কেঁদে ফেললেন। সুফী সাহেবের অচেতন দেহ থেকে আবার আওয়াজ হল যে পীর সাহেব শরিয়ত অবহেলা করেছেন। কিরকম? তার শরিয়ত মোতাবেক চার বিবি নেই।
"চার দিয়াই এ -দুনিয়া, চার দিয়াই আখেরাত। চারদিকে যা দেখ, সবই খোদা চার চিজ দিয়া পয়দা করিয়াছেন। চার চিজ দিয়া খোদা তালা আদম সৃষ্টি করিয়া তার হেদায়েতের জন্য চার কেতাব পাঠাইয়াছেন। সেই হেদায়েত পাইতে হইলে মানুষকে চার এমামের চার মযহাবনুসারে চার তরিকা মানিয়া চলিতে হয়। এইভাবে মানুষকে চারের ফাঁদে ফেলিয়া খোদাতালা চার কুরসির অন্তরালে লুকাইয়া আছেন। এর চারের পর্দা ঠেলিয়া আলমে-আমরে নূরে-ইযদানীতে ফানা হইতে হইলে দুনিয়েতে চার বিবির ভজনা করিতে হইবে।"
পীর সাহেব সবাইকে শুনিয়ে বলেছিলেন তার বৃদ্ধ বয়সের কথা।
তখন নবির রূহ বলেছিলঃ "আমি ষাট বৎসর বয়সে নবমবার বিবাহ করিয়াছিলাম।"
তখন পীর সাহেব রাজী না হলে মোহাম্মদের রূহ বলেছিল যে তাহলে তার রূহানী কামালিয়ত হাসেল হবে না। তার মুরিদদের কেউ নফসানিয়তের হাত এড়াতে পারবে না। তখন পীর মুরিদদের কথা ভেবে রাজী হলেন। কিন্তু কোন এক বুড়িকে বিয়ের কথা বললেন। তখন মোহাম্মদের রূহ সুফী সাহেবের শরীরের ভেতর থেকে বলেন যে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। বেহেশতে তার ছবি দেখেছেন। সে হল রজবের স্ত্রী কলিমন। পীর বেটার বউ এর শামিল বললে মোহাম্মদের আত্মা বলে যে সে নিজেও তার পালিত পুত্র যায়েদের স্ত্রীকে নিকাহ করেছিল আর এ তো একজন মুরিদের স্ত্রী। সে সধবা জানালে সূফীর ভেতরে থাকা মোহাম্মদের আত্মা তাকে তালাক দিতে বলে। এরপরই সুফী সাহেব এক বিকট চীৎকার দিয়ে জেগে ওঠে। পীর সাহেব কলিমনকে বিয়ে করতে অপারগতা জানায়। গ্রামবাসী ও খলিফাগণ সবাই এতে পীরের নিজের ক্ষতির সাথে মুরিদদের ক্ষতির কথা বলে। এরপর পীরসাহেব রাজি হন।
"বাপ-চাচা, পাড়া-পড়শির অনুরোধে, আদেশে, তিরস্কারে ও অবশেষে উৎপীড়নে তিষ্ঠিতে না পারিয়া রজব তার এক বছর আগে বিয়া করা আদরের স্ত্রীকে তালাক দিয়া কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছিতে মুছিতে বাড়ির বাহির হইয়া গেল। কলিমনের ঘন ঘন মূর্ছার মধ্য অতিমাত্র ত্রস্ততার সঙ্গে শুভকার্য সমাধা হইয়া গেল।"
এমদাদ সবকিছু অবাক হয়ে দেখছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ সচেতন হয়ে সামনে বরের আসনে বসা পীর সাহেবের সামনে গিয়ে তার মেহেদি রাঙ্গা দাড়ি ধরে হেচকা টান মেরে বললঃ " রে ভন্ড শয়তান, নিজের পাপ-বাসনা পূর্ণ করিবার জন্য দুইটা তরুণ প্রাণ এমন দুঃখময় করিয়া দিতে তোর বুকে বাজিল না?"
ঘটনা এরপর কি ঘটল তা পাঠককে আর বলে দিতে হবে না। যথারীতি উত্তম মাধ্যম শুরু হয়ে গেল। এমদাদ গ্রামের মাতব্বরের দিকে চেয়ে বললঃ "তোমরা নিতান্ত মূর্খ। এই ভন্ডের চালাকি বুঝিতে পারিতেছ না? নিজের শখ মিটাইবার জন্য সে হযরত পয়গম্বর সাহেবকে লইয়া তামাশা করিয়া তাঁর অপমান করিতেছে। তোমরা এই শয়তানকে পুলিসে দাও।"
এমদাদ যে পাগল হয়ে গেছে, তার এই কথার পর আর কারও কোন সন্দেহ থাকল না। তাকে যখন সবাই মাতব্বরের হুকুমে কান ধরে গ্রামের বাইরে ভাগিয়ে দিয়ে আসতে যাচ্ছিল, তখন পীর সাহেব বললেনঃ "খোদা যাকে শাফা না দেন, তাকে কে ভাল করিতে পারে?"
############
এই হল 'হুযুর কেবলা' গল্পের মূল কাহিনী। এটার নাট্যরূপ দিতে গেলে কোন জায়গায় কেমন বাক্য বসাতে হবে, তা পাঠকরা আমার চেয়ে ভাল বলতে পারবেন। তরুণ প্রজন্মকে ফাঁকি দেয়া সহজ নয়।

0 comments:
Post a Comment