আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে মুসা সংক্ষেপে আল খাওয়ারিজমি (খারিজমি) জন্মগ্রহণ করেন পারস্য দেশে অর্থাৎ বর্তমান ইরানে। তিনি ছিলেন ৯ম শতাব্দীর মানুষ। তিনি গণিত এবং রাতের তারা ভরা আকাশ ভালবাসতেন। ভূগোলবিদ্যাতেও তার খুব আগ্রহ ছিল। হিন্দু গণিততত্ত্বকে তিনি স্পেনে নিয়ে গেছেন এবং সেখান থেকে ইউরোপে প্রবেশ করেছে।
খলিফা আল মামুনের পক্ষ থেকে জ্ঞানগৃহে'র পন্ডিতদলে যোগ দেয়ার জন্য আল-খাওয়ারিজমি ডাক পেয়েছিলেন। তখন তিনি পারস্য ত্যাগ করে বাগদাদে চলে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন। খুব উৎসাহ নিয়ে তিনি গ্রিস, পারস্য এবং ভারত থেকে আসা ও অনুদিত হওয়া বইগুলো অধ্যায়ন শুরু করেন। ভারত থেকে নতুন নিয়ে যাওয়া বইগুলো পড়ার প্রতি তিনি খুবই আগ্রহী ছিলেন। এই সময়ে প্রখ্যাত হিন্দু মহাকাশবিদ ও গণিতবিদ 'ব্রহ্মগুপ্ত' রচিত 'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত' গ্রন্থটি তিনি হাতে পান।
ব্রহ্মগুপ্ত'কে পরিচিত করাতে গিয়ে বিখ্যাত অনলাইন বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াতে লেখা আছে -"ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮-৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ) একজন ভারতীয় গণিতবিদ ও মহাকাশবিদ। তিনি গণিত ও মহাকাশবিদ্যার উপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। তার সবচাইতে বিখ্যাত কাজ হল 'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত'। এই গ্রন্থটি ভীলমলে বসে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে লেখা হয়েছিল। এর ২৫টি অংশে বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্তহীন গাণিতিক সমাধানের নিদর্শন আছে।
ব্রহ্মগুপ্ত ৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের উত্তর দিকে অবস্থিত রাজস্থানের ভীলমল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। গুর্জরদের শক্তিকেন্দ্র হল ভীল্লমালা। ব্রহ্মগুপ্তের পিতার নাম জিষ্ণুগুপ্ত। খুব সম্ভবত তিনি তার জীবনের বেশিরভাগ সময় ভীল্লমালা (আধুনিক ভীলমল) নগরে বাস করতেন। এই এলাকা রাজা ভীগুমুখের শাসনাধীন ছিল। ফলে ব্রহ্মগুপ্ত প্রায়ই 'ভীল্লামালাচার্য' হিসেবে অভিহিত হতেন। এর অর্থ 'ভীল্লমালা থেকে আগত শিক্ষক'। তিনি উজ্জ্বয়ন নগরীর মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ছিলেন। এই সময়কালে তিনি গণিতশাস্ত্র ও মহাকাশবিদ্যার উপর চারটি গ্রন্থ রচনা করেন। 'কদমেকেলা' ৬২৪ সালে, 'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত' লেখেন ৬২৮ সালে, 'খন্দখদক' গ্রন্থটি রচনা করেন ৬৬৫ সালে এবং 'দুর্কিসনরদ' লেখেন ৬৭২ সালে।
'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত' (ব্রহ্মের ত্রুটিমুক্ত গবেষণা) তার সবচাইতে বিখ্যাত গ্রন্থ। ইতিহাসবিদ আল-বিরুনি (১০৫০) সালে তার বই 'তারিখ-আল-হিন্দ' এ উল্লেখ করেছেন যে আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন ভারতবর্ষে একটি দুতাবাস খুলেছিলেন। ভারত থেকে বাগদাদে নিয়ে আসা একটি বই আরবি ভাষাতে রূপান্তর করা হয় এবং তার নাম রাখা হয় 'সিন্ধহিন্দ'। একথা সহজে বোধগম্য যে 'সিন্ধহিন্দ' ব্রহ্মগুপ্তের 'ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত' ছাড়া অন্য কিছু নয়।
অনেকে বিশ্বাস করেন যে, ব্রহ্মগুপ্ত কিছু নিজস্ব বিধিবিধান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে প্রথম শূন্যের ব্যবহার করা শুরু করেন। কিন্তু এই ধারণা সত্যি নয়। আমরা আগেই জেনেছি যে বৈদিক যুগের মানুষরা দশমিক পদ্ধতির আবিষ্কার করেছেন, আর তার বাস্তবায়ন শূন্য ছাড়া সম্ভব নয়। দর্শনগত দিক থেকে শূন্য হিন্দু ধর্ম-দর্শনের একটি স্বতন্ত্র ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। হিন্দু দর্শন মনে করে পদার্থ পাঁচটি বস্তু বা পঞ্চভূত দিয়ে তৈরি। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম এই পাঁচটি উপাদান দিয়ে সমস্ত পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। পঞ্চম উপাদান ব্যোম অর্থ 'কিছুই না', শূন্য, অস্থিত্বহীন।
আধুনিক বিজ্ঞান মতে সবকিছু তৈরি হয়েছে পরমানু দিয়ে। পরমানু নিউক্লিয়াসকে ঘিরে তৈরি হয়। এই নিউক্লিয়াস পরমানুর চাইতে ১০০০ গুণ ছোট। পঞ্চাশ বছর আগেও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না যে পরমানু কি দিয়ে তৈরি। ধারণা করা হত পরমানুর মূল উপাদান ফোটন ও নিউট্রন। এগুলোকে একসাথে হ্যাড্রন বলা হয়। এটা নিউক্লিয়াসের চাইতে আকারে ১০০ ভাগ ছোট। পরমানুর উপাদানসমূহ তার মাত্র ১০-১৫ ভাগ জায়গা দখল করে রাখে। বাকী অংশসমূহ থাকে একেবারে ফাঁকা, শূন্য। ১৯৬৪ সালে মি. গিলম্যান (Gellemann) এবং মি. জি. জুইগ (Mr. G. Zweig) যৌথ সিদ্ধান্তে আসেন যে 'হ্যাড্রন' তৈরি হয় আরও ছোট কণা 'কোয়ার্ক' দিয়ে। হ্যাড্রনের চাইতে হাজারগুন ছোট কোয়ার্ক প্রকৃতিতে থাকতে পারে বলে তারা ভবিষ্যৎবাণী করেছেন।
কোন তারাকে প্রজ্জ্বলিত রাখার জ্বালানী হল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। জ্বালানীর অভাব ঘটলে ইলেকট্রন ভেঙে যাবে, তখন এই তারাটি পরিণত হবে 'লাল দানব' অথবা 'নিউট্রন তারা'তে। শেষে পরিণত হবে 'ব্লাক হোল'- এ। তারার শেষ জীবনের পরিবর্তিত এই সময়গুলোতে পদার্থের ঘনত্ব অবিশ্বাস্য রকমের বেশি হয়।
নিউট্রন তারাতে ১০১৪ গুণ অথবা একশত মিলিয়ন মেট্রিক টন প্রত্যেক এক ঘন সেন্টিমিটারের ওজন। ব্লাক হোল অবস্থায় এর পরিমাণ আরও বেশি।
উপরের আলোচনা থেকে একথা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, 'অস্থিত্বহীন' বা 'শূন্যের' উপরস্থিতি হিন্দু ঋষিদের দীর্ঘদিনের নিবিষ্ট ধ্যানের উদ্ভাবন। এটাই বাস্তব সত্য। বৈদিক ঋষিগন দর্শনের শূন্যবোধ ও 'গণিতের শূন্য' এই দুটি সভ্যতর সূত্রের উদ্ভাবক ছিলেন। ধ্রুপদী বৈদিক যুগোই এর আবিষ্কার ঘটেছিল।
পূর্বপাঠ
ভারতীয় সংখ্যাতত্ত্বের প্রাচীনত্বের নিদর্শণ
বিশ্ব সভ্যতার সুতিকাগার ভারতবর্ষ
সূত্র: Dr Radhasyam Brahmachari এর How Muslims carried Hindu Wisdom to the West, Part 2। লিংক
Sunday, August 26, 2012
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

0 comments:
Post a Comment